মেনু নির্বাচন করুন
Text size A A A
Color C C C C

বগুড়ার কৃষি

 

বগুড়া জেলা বাংলাদেশের অন্যতম কৃষি প্রধান জেলাগুলোর মধ্যে একটি। যমুনা, বাঙ্গালী ও করতোয়া নদী বিধৌত বগুড়া জেলা উত্তরবঙ্গের প্রাণকেন্দ্র ও শস্যভান্ডার হিসাবে খ্যাতি অর্জন করেছে। খাদ্যশস্য উৎপাদনে উদ্বৃত্তের পাশাপাশি এ জেলায় উৎপাদিত মরিচ, শাক-সবজি, আলু ও করলার জন্য দেশব্যাপী এ জেলার রয়েছে বিশেষ পরিচিতি। এ জেলার ভূ-প্রকৃতি ও মাটি কৃষির জন্য যথেষ্ট উপযোগী বিধায় প্রচুর কৃষি ফসলের চাষ হয়। করতোয়া নদী এ জেলাকে মূলত দ’টি ভূ-গঠনে ভাগ করেছে। করতোয়া নদীর পূর্ব ভাগে রয়েছে ৬০% কৃষি জমি যা বহুবিধ ফসল উৎপাদনের উপযোগী পলল এলাকা নামে পরিচিত এবং এখানে উৎপাদিত ফসলের মধ্যে ধান, গম, পাট, ভূট্টা, ডাল, সরিষা, মরিচ, কলা, পেঁপে সবজি ফসল ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। আর করতোয়া নদীর পশ্চিমাংশে রয়েছে ৪০% কৃষি জমি সমতল বরেন্দ্র ভূমি হিসাবে খ্যাত যা এক সময়ে ধান উৎপাদনের এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল। বর্তমানে সেচ সুবিধার সম্প্রসারণ, আধুনিক চাষাবাদ কলাকৌশাল ব্যবহার এবং যমুনা বহুমুখী সেতু চালু হওয়ার ফলে এ জেলার প্রচলিত ফসল বিন্যাসে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। বরেন্দ্র এলাকায় বৎসরে কমপক্ষে দু’টি ধান উৎপাদনের মধ্যবর্তী সময়ে সরিষা, আলু এবং সীমিত আকারে শাক-সবজীর চাষ হয়। নিচে কৃষি বিষয়ক একটি চার্ট দেওয়া হলো :

১। মোট আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ ২০০৭-০৮ অনুযায়ী ২৩০০৩৯ হেক্টর

২। মোট নীট ফসল জমির পরিমাণ ২০০৭-০৮ অনুযায়ী ২২৬৭৯৭ হেক্টর

৩। এক ফসলী জমির পরিমাণ ২০০৭-০৮ অনুযায়ী ১০৪১৬ হেক্টর

৪। দু’ফসলী জমির পরিমাণ ২০০৭-০৮ অনুযায়ী ১০৯০৯৫ হেক্টর

৫। তিন ফসলী জমির পরিমাণ ২০০৭-০৮ অনুযায়ী ৯৯৬৭৫ হেক্টর

৬। তিনের অধিক ফসলী জমি ২০০৭-০৮ অনুযায়ী ৭৬২১ হেক্টর

৭। মোট খাদ্য শস্য উৎপাদন (চাল + গম) ২০০৭-০৮ অনুযায়ী ১৩০৬৪১১ মেঃ টন

৮। মোট কৃষক পরিবার ২০০৭-০৮ অনুযায়ী ৫৯৫৪৮৮ টি

৯। ভূমিহীন পরিবার ২০০৭-০৮ অনুযায়ী ১৮৯৮৭৩ টি

১০। প্রান্তিক পরিবার ২০০৭-০৮ অনুযায়ী ২৪৮০৮৬ টি

১১। ক্ষুদ্র পরিবার ২০০৭-০৮ অনুযায়ী ৯৮২৬৩ টি

১২। মাঝারী পরিবার ২০০৭-০৮ অনুযায়ী ৫১৩০৫ টি

১৩। বড় পরিবার ২০০৭-০৮ অনুযায়ী ৮৬৬১ টি

(প্রাপ্তঃ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, বগুড়া। কৃষি ডাইরী)

বগুড়া জেলায় খাদ্য শস্যের মধ্যে ধানই প্রধান। এ জেলায় তিন ধরনের ধান চাষ হয় যা নিচের ছকে দেখান হলো-

আউশ ধানঃ উঁচু জমি ও অগভীর পানি বিশিষ্ট এলাকায় চাষ হয়। আউশ ধান চাষের জন্য দো-আঁশ থেকে এঁটেল দো-আঁশ মাটি উত্তম। আর এ ধান ফাল্গুনের মাঝামাঝি থেকে বৈশাখের মাঝামাঝি সময়ে বপন করে শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে সংগ্রহ করা হয়। এ কারণে আউশ ধানকে ভাদই বা খরিফ ফসলের অন্তর্গত করা হয়েছে। আউশ ধানের উৎপাদন বিঘা প্রতি অনেক কম হওয়ায় এর পরিবর্তে ঐ সময়ে উচ্চ ফলনশীল ইরি আউশ ধানের চাষ করা হয়। কাচামনি, কৈতরমনি গড়িয়া, ধলাগড়িয়া, কাশিয়াবান্ধা, গড়ানা, বালন, ভাদাই প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য আউশ ধান। ২০০৭-০৮ সালে ২৩৭৭৯ হেক্টর জমিতে আউশ ধানের চাষ হয় এবং ঐ সালে আউশ ধানের উৎপাদনের পরিমাণ ছিল ৪৯১৯০ মেঃ টন।

আমন ধানঃ অপেক্ষাকৃতি নিম্নভূমিতে ভাল চাষ হয়। অর্থাৎ প্রয়োজনীয় পানি দাঁড়ানোর উপযোগী সমতল ভূমিতে এ ধানের চাষ ব্যাপকভাবে হয়ে থাকে। এ ধরনের ধানকে অগ্রানি বা হৈমান্তিক ফসল বলা হয়। বগুড়া জেলায় দু’ধরনের আমন ধানের চাষ হয়। যেমন-রোপা আমন ধান জৈষ্ঠ্য-আষাঢ় মাসে বীজতলায় ধানের বীজ ছড়িয়ে দেওয়া হয় এবং ৪ থেকে ৬ সপ্তাহ পর থেকে চারা তুলে নিয়ে শ্রাবণ মাস হতে আশ্বিন মাসের মধ্যে জমি ভালভাবে তৈরি করে চারা রোপণ করা হয়। কার্তিক মাসের মাঝামাঝি থেকে পৌষ মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে পাকা ধান সংগ্রহ করা হয়। রাজাশাইল, বাদশাভোগ, দুধসর, চিতরাজ, বাঁশফুল, যোশোবালাম, পাইজাম, মিনিকেট ইত্যাদি উচ্চ ফলনশীল আমন ধান প্রচুর উৎপাদন হয়। কাহালু ও নন্দীগ্রাম উপজেলা ধানের বিখ্যাত বন্দর। এ সব বন্দর থেকে প্রচুর ধান ট্রাক যোগে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হয়। নিচের সারণীতে উপজেলা ভিত্তিক আমন ধানের চাষ (একরে) ও উৎপাদনে মেট্রিক টনে প্রদত্ত হলোঃ

(চাষ একরে ও উৎপাদন মেট্রিক টনে)
আদমদিঘী- ৩১৩৫০ একর ২৫০৮০ মেঃ টন কাহালু- ৪৫৫৪৯ একর ৪২২৬৯ মেঃ টন
বগুড়া সদর- ২৫০২০ একর ২০০১৬ মেঃ টন নন্দীগ্রাম- ৫৩৩২৫ একর ৪৭৯৯২ মেঃ টন
ধুনট- ১৮৬৭০ একর ১৫০৬৬ মেঃ টন সারিয়াকান্দি- ২২৮৮০ একর ২০৫৯২ মেঃ টন
দুপচাঁচিয়া- ৩০০৭২ একর ২৭০৬৪ মেঃ টন শিবগঞ্জ- ৫০৮৫৯ একর ৪৮৩১৬ মেঃ টন
গাবতলী- ৩৪০২৫ একর ২৬৭০৯ মেঃ টন সোনাতলা- ১৮৯৬৯ একর ১৩৯৪২ মেঃ টন
শাহজাহানপুর- ৩৩৬৫০ একর ৩১৫৯৭ মেঃ টন শেরপুর- ৪৬৯০৩ একর ৪৪৫৫৭ মেঃ টন

উৎসঃ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান অধিদপ্তর, বগুড়া শাখা।

ধান চাষ (দেশী ও উফশীজাত ২০০৭-০৮)

 

বুনা আমন ধানঃ বন্যা কবলিত এলাকায় ও ডুবা অঞ্চলে চাষ হয়। পানি বৃদ্ধির সাথে সাথে ধানের গাছও বৃদ্ধি পায়। বালাম, সমুদ্রকালি ও কটকতারা এ প্রকৃতির ধান। তবে বগুড়ায় এ ধরনের ধান চাষ কম হয়।

বোরো ধানঃ শুষ্ক ঋতুতে চাষ হয়। উত্তম সেচ সুবিধা বিশিষ্ট কর্দমাক্ত নিচু জমি বোরো ধান চাষের জন্য বিশেষ উপযোগী। পৌষ-মাঘ মাসে বীজতলা থেকে চারা তোলে রোপা আমনের মত বোরো চারা রোপন করতে হয়। ফাল্গুন-চৈত্র-বৈশাখ মাসে এ ধান ঘরে তোলা হয়। আর এ ধানের ফসল অত্যন্ত বেশি বিধায় ব্যাপকভাবে এর চাষ হয়। নিচে উপজেলা ভিত্তিক বোরো ধানের চাষ ও উৎপাদনের সারণী দেওয়া হলোঃ

বোরো ধান ২০০৭-০৮ (উফশী ও হাইব্রিড)

 

উফশী একর

হাইব্রিড একর

উফশী মেঃ টন

হাইব্রিড মেঃ টন

আদমদিঘী-

২৬৫৮০

৫৪৩০

৪১৬৬২

১১১৭

বগুড়া সদর-

২০৩১০

৬৩২০

৩০৯৬০

১২৩৭৬

ধুনট-

২৮৮৭৫

১১৮৮৫

৪৯৫৭১

২২২৮১

দুপচাঁচিয়া-

২৫৮২৫

৭৪১৫

৩৩৯৮৬

১৪৩৫৫

গাবতলী-

৩৯৯৯৯৭

১৫০১০

৪৯০২৮

৩৩৪৭২

কাহালু-

৪০২০২

৬২৯৮

৫৪৬৫৯

১২৭১০

নন্দীগ্রাম-

৫১৯০০

১১০০

৭০০৬৫

২০৩৫

সারিয়াকান্দি-

২৫১১০

৪৩৯০

৩৪৫২৬

১০০৯৭

শেরপুর-

৩৫৭৮২

১১৯২৫

৬০১১৩

২২২৫২

শিবগঞ্জ-

৩৬৭৩০

১৪৮২০

৫৫৩৮৩

৩৩৩৪৫

শাহজাহানপুর-

২৬০৩০

৬৩৯৭

৪৬২৯৪

১৪০৬৮

সোনাতলা-

২০০৪২

৬০৫০

৩৪০১৫

১১৪৬৪

 

 

উৎসঃ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান অধিদপ্তর বগুড়া শাখা।

গমঃ গম বগুড়ার পূর্বাঞ্চলে অর্থাৎ করতোয়া নদীর পূর্বাঞ্চলে চাষ হয় এবং বগুড়া পশ্চিমাঞ্চলের গমের চাষ খুব সামান্য হয়। শীতের মৌসুমী গমের চাষ হয় এবং বসন্তের শুরুতে সংগ্রহ করা হয়। তবে গমের উৎপাদন খুব কম হয়। নিচের সারণীতে উপজেলা ভিত্তিক গমের চাষ ও উৎপাদনের তথ্য দেওয়া হলোঃ

 

গম চাষ (২০০৭-০৮)

আদমদীঘি-

৬ একরে

৫৩৭৬ কেজি

বগুড়া সদর-

১২৯ একরে

৮৯১৩৯ কেজি

ধুনট-

৩৫ একরে

২৩৯০৫ কেজি

দুপচাঁচিয়া-

১৬ একরে

১২৪০০ কেজি

গাবতলী-

৬১২ একরে

১৪১২৪০ কেজি

কাহালু-

৪৫ একরে

৩১১৮৫ কেজি

নন্দীগ্রাম-

১০ একরে

৬০০০০ কেজি

সারিয়াকান্দী-

১২২৫ একরে

৮৫৬১০০ কেজি

শেরপুর-

১৪৯ একরে

৯৮৩৪০ কেজি

শিবগঞ্জ-

১৩০ একরে

১১৭০০০ কেজি

শাহজানপুর-

১১৬ একরে

১০৫৭৯২ কেজি

সোনাতলা-

৫৪৪ একরে

৪৭৮৭২০ কেজি

 

 

উৎসঃ বাংলাদেশ পরিসংখ্যান অধিদপ্তর, বগুড়া শাখা।

এছাড়াও বগুড়া জেলার চর অঞ্চলে প্রচুর পরিমাণ রবিশস্য জন্মে থাকে। রবিশস্যের মধ্যে সরিষা, তিল, ছোলা, তিসি, সীম, রাই, মটর, মসুর, খেসারী, অড়হর, মাশ, মুগ ইত্যাদি। এগুলোর অধিকাংশ কার্তিক, অগ্রহায়ন ও পৌষ মাসে চাষ হয়। তরিতরকারীর মধ্যে গোল আলু, বেগুন, পটল, কলা, মানকচু, বৌকচু, ওল, মিষ্টি আলু, পাতাকপি, ফুলকপি, গাজর, ঝিঙ্গা, করলা, শসা, খিরা, কুমড়া, লাউ ইত্যাদি এবং মসলা জাতীর মধ্যে পিয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, কালাজিরা, মরিচ, রাধুনী পাতা ইত্যাদির চাষ হয়।